পবিত্র আশুরা
আজ ইসলামের ইতিহাসে শোক, শিক্ষা ও আত্মত্যাগের তাৎপর্যপূর্ণ দিন
-
আপলোড সময় :
০৬-০৭-২০২৫ ০২:৪৯:২০ অপরাহ্ন
-
আপডেট সময় :
০৬-০৭-২০২৫ ০২:৪৯:২০ অপরাহ্ন
প্রতিকী ছবি।
আজ রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫, হিজরি ১০ মহররম, মুসলমানদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও শোকাবহ দিন—পবিত্র আশুরা। দিনটি ইসলামের ইতিহাসে গভীর বেদনা, শিক্ষা ও আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে বিবেচিত। হিজরি ৬১ সনের এই দিনে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে সত্য ও ন্যায়ের পতাকা উঁচিয়ে জীবন বিসর্জন দেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এই আত্মত্যাগ মানবজাতির জন্য সত্য, ন্যায় ও ইসলামের আদর্শে দৃঢ় থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আশুরা শব্দের অর্থ দশম। এটি আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘দশ’। আর মহররম অর্থ ‘সম্মানিত’। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়ে এসেছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আশুরার রোজা পালন করলে বিগত এক বছরের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। প্রাথমিকভাবে ইসলাম ধর্মে মহররম মাসের রোজা ফরজ ছিল, তবে দ্বিতীয় হিজরিতে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল হিসেবে বিবেচিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা পালনের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন এবং এদিনের সঙ্গে একদিন পূর্বে (৯ মহররম) ও একদিন পরে (১১ মহররম) রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, ইহুদিরাও আশুরার দিন রোজা পালন করত, সে জন্য নবী করিম (সা.) মুসলমানদের পৃথক ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলমানরা আজকের দিনটি নফল রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-খয়রাত ও আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে পালন করছেন। দেশের প্রধান প্রধান মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আজ আলোচনা সভা, কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আজ বাদ জোহর ‘পবিত্র আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। সভায় বক্তব্য রাখবেন মদিনাতুল উলুম মডেল ইনস্টিটিউট মহিলা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা মো. মুজির উদ্দিন এবং সভাপতিত্ব করবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুনূর রশীদ।
আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে মুসলমানদের জীবনে আশুরার তাৎপর্য তুলে ধরে শান্তি, সহমর্মিতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণীতে বলেন, আশুরার মর্মবাণী আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ়তা অর্জনে সাহস জোগায়। তিনি এই মহান দিনে শহীদ ইমাম হোসাইন (রা.) এবং কারবালায় শাহাদতবরণকারী সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং মুসলমানদের হাদিস মোতাবেক নেক আমল করার আহ্বান জানান।
এদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিতে বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মিছিলে ধারালো অস্ত্র—যেমন দা, ছুরি, বল্লম, তরবারি, লাঠি, আতশবাজি বা পটকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এসব নিষিদ্ধ বস্তু ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করে এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান আশুরাকে ইবাদতের মাধ্যমে পালন করলেও কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়ের মতো তাজিয়া মিছিল বা শরীর রক্তাক্ত করার মতো রীতিনীতি পালন করে থাকেন। ইসলামিক স্কলারদের মতে, শরীর রক্তাক্তকরণ, রণ-মহড়া, মোমবাতি জ্বালানো, মর্সিয়া পাঠ, বিয়ে বন্ধ রাখা, বিশেষ খাবার আয়োজন করে তা বাড়িতে বাড়িতে বিতরণ করা, এসবের কোনো হাদিসসম্মত ভিত্তি নেই। বরং এসব কুসংস্কার হিসেবে বিবেচিত। হাদিস মোতাবেক আশুরার সঠিক আমল হলো রোজা রাখা, নফল নামাজ পড়া, দোয়া করা, এবং পরিবার-পরিজনের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের আয়োজন করা।
ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ মুসলমানদের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কারবালার ঘটনা আমাদের শেখায়, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্যের পক্ষে দৃঢ় থাকা, ইসলামি আদর্শে অটল থাকা এবং মানবতার কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। এছাড়াও এইদিনে মুসা আঃ এর লোহিত সাগর পাড়ি দেওয়ার ঘটনাও এইদিনে করেছিল বলে জানা যায় ইহুদীদের ইতিহাসে। এইদিন তাদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে মুসা আঃ তাদের নিয়ে সাগর পাড়ি দেন সেইসাথে ফেরাউনের দলের সমুদ্রপৃষ্ঠ হওয়ার ঘটনাও ইতিহাসে ঘাটলে জানা যায়। যার জন্য হযরত মোহাম্মদ সঃ এই দিনে রোজা রাখার কথা বলেছেন। তাই মুসলিম সমাজে এই পবিত্র আশুরার দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিজস্ব প্রতিবেদক
কমেন্ট বক্স